১ টি মন্তব্য

বাংলাদেশে মার্কিন দুর্গ এবং ‘সুশীল সমাজ’: আনু মুহাম্মদ


বর্তমানে আমরা এমন সময় পার করছি যখন বাংলাদেশে মার্কিন-ভারত আধিপত্য এবং বহজাতিক পুঁজির শৃঙ্খল পাকাপোক্ত করবার চেষ্টা চলছে। এই আধিপত্য ও শৃঙ্খল নতুন করে যে হচ্ছে তা নয়, তার জাল অনেক দিন থেকেই আমাদের সমাজে ধীরে ধীরে ছড়িয়েছে যার প্রধান আশ্রয় এদেশেরই ‘সুশীল সমাজ’।


বাংলাদেশে সবচাইতে সুরক্ষিত ভবন কোনটি? কোনরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই এর উত্তর বলা যায়: ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। এটি আসলে একটি দুর্গ। মার্কিন প্রশাসনের প্রতিনিধিরা দূর্গে বসবাস করেন, এটা তাদের ক্ষমতা নয় বরঞ্চ প্রকাশ করে যে তারা এদেশের জনগণের ভয়ে নিদারুণ ভীতসন্ত্রস্ত। কোন হামলা বা হুমকি উপস্থিত না হলেও এটি ক্রমাগত অধিক থেকে অধিকতর হারে ‘হামলা মোকাবিলার’ নতুন নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এই দূর্গের কাছাকাছিও এদেশের মানুষের পক্ষে যাওয়া কঠিন। এই ভীতি মার্কিনীদের বাড়ছে নিজেদের বর্তমান ও পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ অপকর্ম সম্পর্কে ধারণা থেকেই। পালানোর ব্যবস্থা অটুট রেখেই এরা ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই হয়েছিল। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রশক্তি এবং সামাজিক ক্ষমতা যেভাবে বিন্যস্ত হয়েছে তাতে এদেশে তার জায়গা করে নিতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯৭২ এর শেষ থেকেই বাংলাদেশে পাকিস্তানী গণহত্যাকারীদের প্রবল সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদি তাদের জায়গা করে নিয়েছে। ক্রমে গত তিন দশকে এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে সবচাইতে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে বৃহৎ ব্যবসায়িক সংস্থা, লুটেরা কোটিপতি সমাজ, বৃহৎ এনজিও এর গায়ে লেগে লেগেই যুক্তরাষ্ট্র আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের সমাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সাধারণভাবে মিশ্র। এটি একদিকে সর্বশক্তিমান প্রভু অন্যদিকে মহাক্ষমতাধর শয়তান। একদিকে ঘৃণিত অন্যদিকে বেহেশতের মতো স্বপ্নের গন্তব্য। বিরোধী মনোভাবের নানা সমষ্টিগত প্রকাশ কম হলেও দেখা গেছে পাকিস্তান আমল থেকেই। পাকিস্তান বরাবরই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি বশ্য রাষ্ট্র। এখনও তাই আছে। এখন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কেন্দ্র।
পাকিস্তান তার জীবনের শুরুতেই পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অংশ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ গঠন করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনার ও তৎপরতার এটি অন্যতম সংগঠিত কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ভিয়েতনামে মার্কিনী বর্বরতার বিরুদ্ধে এদেশে বামপন্থীদের সভাসমাবেশ ৬০ দশকের ধারাবাহিকতায় ৭০ দশকের প্রথমদিকেও কিছু হয়েছে। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ছাত্র ইউনিয়নের সেরকম একটি মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে শহীদ হয়েছিলেন মতিউল ও কাদের। মার্কিন তথ্য দপ্তর এরপর মানুষের সামনে থেকে দূতাবাসের নিরাপত্তা ব্যুহের মধ্যে স্থানান্তর করা হয়।
বাংলাদেশে এরপর কয়েকটি ব্যতিক্রম সময় বাদে মার্কিন বিরোধী সভাসমাবেশ ব্যাপক মানুষকে টানতে পারেনি। ১৯৯১ সালে ইরাক আক্রমণ কিছু প্রতিবাদ সমাবেশ ঘটিয়েছিল কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০০১ সালে আফগানিস্তান আক্রমণ জনমনে মার্কিনী চেহারা অনেক খোলাসা করে। ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে ইরাক আক্রমণ এদেশের মানুষকে প্রবলভাবে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। কারণ অন্যান্য আক্রমণ যৌক্তিক করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচারণা মানুষকে হয়তো বিভ্রান্ত করে থাকতে পারে; কিন্তু সর্বশেষ ইরাক আক্রমণ এমনভাবে হয়েছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার সহগামী রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোরও সমর্থন পায়নি। সুতরাং কোন প্রচারণাই মানুষকে নিরস্ত করতে সক্ষম হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল চৌর্যবৃত্তি ও জালিয়াতির মাধ্যমে বুশের প্রেসিডেন্ট হবার ঘটনার স্মৃতি।
ইরাক আক্রমণ কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যে মার্কিন বিরোধী বিক্ষোভ দেখা যায় সেটা ছিল এককথায় অভূতপূর্ব। বামপন্থী দল ও বিভিন্ন গ্র“প তাদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনীতির ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। বিভিন্ন ইসলামী দল ও গ্র“প ইরাক আক্রমণকে মুসলমানদের উপর ইহুদী-নাছাড়াদের আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা থেকে নানা কর্মসূচি নেয়। কিন্তু আগের বিভিন্ন বিক্ষোভ তৎপরতার সঙ্গে এবারের প্রধান পার্থক্য তৈরি হয়েছিল জনগণের স্বত:স্ফূর্ত জাগরণ ও অংশগ্রহণ। এবারের বিভিন্ন বিক্ষোভ তৎপরতায় বড় বৈশিষ্ট্যই ছিল রাজনৈতিক উদ্যোগের বাইরে থেকেই সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজ নিজ মতো প্রতিবাদ প্রকাশ।
বাংলাদেশের শহর গ্রাম গঞ্জ রেললাইনের পাশ দিয়ে সর্বত্র সেসময় হাজার হাজার বুশ ঝোলানো ছিল, গাছে, বিদ্যুৎ থামে, দেয়ালে, বাঁশ লাগিয়ে। ছবি কিংবা পাট খড়ি ইত্যাদি দিয়ে বানানো। বেশিরভাগই কাঁচা হাত কিন্তু বুঝতে কোথাও অসুবিধা হয়নি। কোথাও গলায় ফাঁসি, কোথাও হাত জোড় করা, কোথাও শয়তান চেহারায়, কোথাও হাত পা বাঁধা, কোথাও গলাভর্তি ছেড়া জুতা স্যান্ডেল, কোথাও বুকে ছুরি মারা। আর সবজায়গাতেই সাথে ছিল ক্ষুদ্রাকার টনি ব্লেয়ার। মানুষ পাশ দিয়ে যাবার সময় থুথু দেয়, লাথি মারে, গাল দেয়। গণআদালতও হয়েছে অনেক। সবচাইতে কম সাজা হয়েছে ফাঁসি। মিছিল মিটিং এর কোন শেষ ছিল না। ছাপা তো ছিলই হাতে লেখা পোস্টারও প্রকাশিত হয়েছিল অজস্র। কবিতা গান নাটকেরও কোন শেষ ছিল না। গানের ক্যাসেটও বের হয়েছিল বেশ কয়েকটি। এমনকি শিশুরাও তখন আঁকাজোকা বা খেলাধূলার মধ্যে বুশকে বধ করতে বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। সাদ্দাম হোসেন হয়ে উঠেছিলেন নায়ক।
এই অভূতপূর্ব বিক্ষোভ চেতনার পেছনে কী কার্যকর ছিল? এর ধারাবাহিকতা কোথায়? মার্কিন বিরোধী এই চেতনার রাজনৈতিক প্রকাশ কী? মার্কিন প্রশাসন এখানে বাংলাদেশে মার্কিন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামরিক ভিত্তি স্থাপনের ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে এই চেতনা কী বলে? এই ক্ষেত্রে ইরাকের নিপীড়িত মানুষদের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের একাতœবোধ করবার পেছনে কী কাজ করেছিল? এসব প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা এর ধারাবাহিকতা আর দেখতে পাইনি। যদিও মনোজগতে একটা ঘৃণা এখনও জাগরুক আছে। কিন্তু এই ঘৃণায় বাংলাদেশে মার্কিন তৎপরতা খুব বেশি লক্ষ্য হয়নি। তাই অন্যান্য দেশে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বিরোধিতা এদেশে যতটুকু হয়েছে তার একাংশও  এদেশে তার শিরা উপশিরায় বিষাক্ত প্রবেশের বিরুদ্ধে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ চেহারা এখানে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধের ভিত্তি হয়নি। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের ‘শান্তিপূর্ণ’ কাজ সম্পর্কে দিনে দিনে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে ভুল বিশ্বাসের পাহাড়। খলনায়ক পরিণত হয়েছে নায়কে। তাই যুদ্ধ করে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র যা যা দখল বা লুন্ঠনে সক্রিয় তা যুদ্ধ না করেই বাংলাদেশের মতো দেশে তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে। মনোজগতের এই গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বাংলাদেশের মিডিয়াসহ ‘শিক্ষিত’ সমাজের।
ইরাক আগ্রাসনের পর বাংলাদেশে ‘যুদ্ধবিরোধী’ সভা সমাবেশ এ যারা অংশগ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে একাংশ ছিলেন যারা সরকারি জোট, ‘সুশীল সমাজ’ বা এনজিওসহ এদেশের ক্ষমতাবানদেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। এঁদের সামাজিক অর্থনৈতিক ও মতাদর্শিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব আধিপত্যের রাজনীতি, অর্থনীতি ও মতাদর্শের বিরোধিতা করেনা। তাঁদের বিরোধিতা একটি যুদ্ধের প্রতি যা প্রকটভাবে দৃশ্যমান, তাঁরা যুদ্ধের আইনী কাঠামো কিংবা বস্তুগত ভিত্তির বিরোধী নন, তাঁরা যুদ্ধের অর্থনীতিরও বিরোধী নন। তাঁরা আগ্রহী একে একটি মানবিক চেহারা দিতে কিংবা এনিয়ে তাঁদের যতটুকু মাথাব্যথা তা জনমতের চাপের কারণে। এরা যেভাবে ‘মানবাধিকার’, ‘নারী অধিকার’, ‘গরীব উন্নয়ন’, ‘শিশু অধিকার’ নিয়ে আলোচনা করেন বা জনমত গঠন করেন তাতে এটা স্পষ্ট যে তাঁরা একটি ‘শোষণহীন পুঁজিবাদের’ কল্পকথা তৈরির কাজে নিয়োজিত।
কাজেই এদের সমস্যা হয়না মার্কিন রাষ্ট্রদূত বা বিশ্বব্যাংক বাহিনীর কিংবা দেশীয় লুটেরাদের সঙ্গে বসে ‘সন্ত্রাস’ দমন বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার রাস্তা নিয়ে আরামদায়ক আলোচনায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা সন্ধানে। সঙ্গে বসে তল্পীবাহক হয়ে কাজ করতে। মার্কিনী প্রকল্প হিসেবে বন্দর, তেল ,গ্যাস, কয়লাসহ সকল জাতীয় সম্পদ দখলের নীলনকশা নানাভাবে তৈরি হতে থাকে। এমনকি এদের মধ্যে যারা ‘পশ্চিম বিরোধী’ বলে পরিচিত তারা ইরাক আফগানিস্তান বা প্যালেস্টাইন নিয়ে ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী’ হতে আগ্রহী থাকলেও বাংলাদেশের ভেতরে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নানা পথ প্রক্রিয়া বা প্রতিষ্ঠানে নির্দ্বিধায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। এই তল্পীবাহক লেখক তাত্ত্বিক সাংবাদিক এনজিও মালিক প্রচার মাধ্যম সংশ্লিষ্ট লোকজনের অব্যাহত কাজের ফলাফল হল জনগণের মধ্যে ভয়ংকর সব দেশি বিদেশি শক্তির গায়ে মোলায়েম প্রলেপ মাখা ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
এই ‘সিভিল’ গোষ্ঠীর কল্যাণে দখলদার লুন্ঠনকারি দেশি বিদেশি সংস্থা (বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বহুজাতিক তেল কোম্পানি, বিদ্যুৎ কোম্পানি, বীজ কোম্পানি, সামরিক উপদেষ্টা) মানুষের সামনে উপস্থিত হয় দেশিয় উন্নয়নের একমাত্র বাহন এমনকি জনগণের রক্ষাকর্তা হিসেবে। এই সমগ্র মনোজাগতিক আবহাওয়ায় স্বচ্ছন্দে বসবাস করে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার যাবতীয় এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হয়। একটি বড় অংশের মধ্যে মার্কিন বিরোধিতা তাই মুসলমানদের দিক থেকে খ্রীষ্টান এবং ইহুদী বিরোধিতায় নড়াচড়া করতে থাকে, ভারত বিরোধিতা যেমন হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলমানের ক্ষোভ হিসেবে উপস্থিত হয়। বিরোধিতার এই ধরন মার্কিনী ও সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী কেন্দ্র দেশগুলোর জন্য খুব সুবিধাজনক, সুবিধাজনক ভারতের জন্যও। কেননা এই বিরোধিতায় দখল আধিপত্যের আসল জায়গাগুলো আড়াল হয়ে যায়। এগুলো মোকাবিলা করা খুব সহজ; মাদ্রাসা মসজিদ উন্নয়ন ইমাম প্রশিক্ষণ ইত্যাদিতে অর্থ যোগান, ইসলাম ধর্মের মুখস্ত প্রশংসা, ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে উপস্থিত হওয়া এগুলোর অংশ। ব্রিটিশ হাইকমিশনার মুসলমান অশ্বেতাঙ্গ, মার্কিন রাষ্ট্রদূত কৃষ্ণাঙ্গ বা নারী, টাটার প্রতিনিধি বা ভারতীয় রাষ্ট্রপতি মুসলমান হলে যে আধিপত্যের বা দখল লুন্ঠনের সম্পর্কের কোন পরিবর্তন হয়না তা এসব তৎপরতায় ঢাকা পড়ে যায়। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির ক্ষমতাবান অংশ এই দেশে মার্কিনী প্রভাব বলয়ে অনেকদিন ধরেই আছে। খ্রীষ্টান, ইহুদী বা হিন্দুর বিরোধিতা তাই এদেশে মার্কিন ভারত আধিপত্য বৃদ্ধির কোন অসুবিধা হয়নি। এমনকি একধরনের ইসলামী ক্ষমতা এর জন্য অধিকতর উপযোগীই হয়েছে। পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশ তার বড় দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের প্রশাসন তো বটেই এলিট মধ্যবিত্ত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জগতেও মার্কিনী প্রশাসনের বা তাদের নানামুখের উপস্থিতি তুলনায় আরো বেড়েছে। বহু পেশাজীবী সংগঠন যেগুলো আগে নিজেদের গুরুত্ব বৃদ্ধি কিংবা প্রচার সাফল্যের জন্য মন্ত্রী ধরেটরে প্রধান অতিথি বানাতো তাদের অনেকে এখন সুলভ মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বাছাই করছে। বিভিন্ন বিদ্যাজগতীয় সেমিনার সম্মেলনেও এইসব ব্যক্তির উপস্থিতি এবং নির্ধারক বাণী প্রদান প্রায় নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বরাবরই একটি অদৃশ্য ও পর্দার আড়ালের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে।  এই আড়ালের ব্যাপারটি এখন অনেক দূরীভূত হয়েছে। মার্কিনীদের দিক থেকেও এর প্রয়োজনবোধ অনেক কমেছে মনে হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সভা, বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের যখন ঘনঘন দেখা যাচ্ছে, মিডিয়ায় উপস্থিতি বেড়েছে এবং সমন জারী হচ্ছে নানারকম, তখন দেশের ভেতর উদ্বেগ আতংক অনিশ্চয়তা অনেক বর্ধমান; দেশের নানাক্ষেত্রে মার্কিনী দখল তৎপরতাও, চুক্তি অচুক্তির মাধ্যমে, ক্রমবর্ধমান।
একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিন্নমতের বিশেষত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তমতের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ৬০ বা ৭০ দশক হয়তো বিশেষভাবে এজন্য স্নরণ করা যাবে। সেসময়ও বর্তমানের মতো দালাল মেরুদন্ডহীন আতœকেন্দ্রিক লোকদের আধিপত্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছিল। থাকেই। কিন্তু সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও এদের উপস্থিতি ম্লান করে দিয়ে উজ্জ্বল সংখ্যালঘুর বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নিপীড়ক ক্ষমতাবান দেশি বিদেশি মূলধারার বলয় বহির্ভূত কেন্দ্র হিসেবে উপস্থিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেরকমই একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল বলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শাসকদের বহুবিধ আক্রমণ ও শ্যেনদৃষ্টির শিকার হয়েছে। সেখানে এরকম ঘটনা যা হয়তো আগে সম্ভব হতো না তা এখন হচ্ছে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত সংগঠন তাদের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে এনে কৃতার্থ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদরা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে ছাড়া কিংবা তাদের এজেন্ডা ছাড়া বড় সেমিনার করতে যেন অক্ষম হয়ে পড়েছেন। ভিন্ন চেষ্টা খুব দুর্বল। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার পন্ডিতদের বড় বড় ব্যয়বহুল গবেষণার সীমা পরিসীমা, সংলাপের, তথ্য উপাত্তের ধরন এসব কর্তা সংস্থাগুলো দ্বারাই এখন নির্ধারিত। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো এদের প্রায় অবাধ রাজ্য। প্রশ্নহীন।
বাংলাদেশে মার্কিন দুর্গ এখন কেবল তার দূতাবাসেই নয়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদেশের ‘শিক্ষিত’ ‘ভদ্র’ ‘সুশীল’ সমাজেও। এই অবস্থাকে স্থায়ী করবার নানা আয়োজন চলছে এখন। কিন্তু বাংলাদেশের সারা বছরে প্রতিরোধের দাগও ছড়ানো। ভরসা সেখানেই।

Advertisements

About এ্যাডমিন

প্রপদ প্রগতির পরিব্রাজক দল এর সংক্ষিপ্ত নাম। প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৯৪ ইং কেন্দ্রীয় কার্যালয়ঃ ডাকসু ভাবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ প্রকৃত স্বাধীনতা ও জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

One comment on “বাংলাদেশে মার্কিন দুর্গ এবং ‘সুশীল সমাজ’: আনু মুহাম্মদ

  1. ভালো লাগলো লেখাটা। ধন্যবাদ স্যার।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: